রাত বারোটা। ঘুমের গভীরে হঠাৎ একটা বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে। আপনি? না, আপনার পাশের মানুষটা। নাক ডাকা শুনে আপনি বিরক্ত, কিন্তু ভাবছেন — “এটা তো স্বাভাবিক, বেশি ক্লান্ত!” কিন্তু যদি বলি, এই আওয়াজটা আসলে শরীরের একটা নীরব ঘাতক রোগ এর ইঙ্গিত দিচ্ছে? হ্যাঁ, আমি কিন্তু মজা করছি না।
আমরা সবাই নাক ডাকাকে হালকাভাবে নিই। কিন্তু গবেষণা বলছে, নাক ডাকা শুধু বিছানার সঙ্গীকে বিরক্ত করাই না, এটা হতে পারে স্লিপ অ্যাপনিয়া নামক একটা জটিল অবস্থার ফ্ল্যাগ। আর এই সমস্যার সাথে ওজন ও ঘুম এর একটা গভীর সম্পর্ক আছে। প্রশ্ন হলো, আপনার ঘুমের সমস্যা কি শুধুই ক্লান্তি, নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর কিছু? আসুন, আজকের আলোচনায় আমরা সেই ওজন-সম্পর্কিত স্লিপ অ্যাপনিয়ার ৬টি লুকনো সংকেত খুঁজে বের করি।
আমার এক বন্ধুর কথা মনে পড়ে যায়। ওর নাম রাজীব। বয়স ৩৫। ওর ওজন একটু বেশি। রাতে ঘুমালে ওর নাক ডাকার শব্দে আমার অন্য বন্ধুরা মজা করত। কিন্তু রাজীবের সমস্যা ছিল অন্য। সারাদিন ঘুম ঘুম ভাব, অফিসে মনোযোগ দিতে পারে না। আমরা ভাবতাম, ও হয়তো অলস। কিন্তু সেই অলসতা আসলে ছিল এক প্রকার অসুস্থতা। ডাক্তার বললেন, এটা স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ। আর দায়ী ছিল ওই বাড়তি ওজনটা।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, নাক ডাকা শুধু একটা আওয়াজ নয়। এটা বিপদের ঘণ্টা। যখন আমরা ঘুমাই, তখন আমাদের গলার পেশীগুলো শিথিল হয়ে যায়। কিন্তু অতিরিক্ত ওজনের কারণে ঘাড়ে আর গলায় চর্বি জমে। সেই চর্বি শ্বাসনালীকে চেপে ধরে। ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আর সেই কষ্টের ফলই হলো এই বিকট শব্দ। কখনো কখনো শ্বাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য। মস্তিষ্ক তখন অক্সিজেনের অভাবে আতঙ্কিত হয়ে শরীরকে জাগিয়ে দেয়। এই যে ঘুমের মধ্যে বারবার জেগে ওঠা, সেটাই মারাত্মক।
আসলে আমরা অনেকেই জানি না, স্লিপ অ্যাপনিয়া যদি অনিয়ন্ত্রিত থাকে, তাহলে তা হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক এমনকি ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়। একটা পরিসংখ্যান বলছে, যারা গুরুতর ওজন-সম্পর্কিত স্লিপ অ্যাপনিয়ায় ভোগেন, তাদের মধ্যে ৭০% মানুষের হৃদরোগের ঝুঁকি অনেক বেশি। ভাবুন তো! এই নীরব ঘাতক রোগটা কিন্তু একদম নীরবে আপনার শরীরের ভিতরটা নষ্ট করছে। আর তার জন্য আমরা দায়ী করছি শুধু রাতের ক্লান্তিকে।

এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কীভাবে বুঝবেন আপনার নাক ডাকা সাধারণ, নাকি স্লিপ অ্যাপনিয়া? সহজ কথায়, সাধারণ নাক ডাকায় শ্বাস বন্ধ হয় না। কিন্তু স্লিপ অ্যাপনিয়ায় মস্তিষ্ক অক্সিজেনের অভাবে বারবার জেগে ওঠে। আর এই জাগরণটা আপনি টেরও পান না। ফলে আপনার গভীর ঘুম হয়ই না। সকালে উঠে মনে হয়, সারারাত যেন একটা ট্রেনের ইঞ্জিনের পাশে শুলে ছিলেন। শরীরে এনার্জি নেই।
আমার এক ক্লায়েন্টের কথা ভাবুন। স্টেফানি। ব্যালে নৃত্যশিল্পী। ওর ওজন বেড়ে যাওয়ার পর থেকেই ওর শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। ও ঘুম থেকে উঠত মাথা ব্যথা নিয়ে। ও ভাবত, বেশি উচ্চতা থেকে লাফ দেয়ার কারণে। কিন্তু পরে বোঝা গেল, ওর ঘুমের সমস্যা আসলে শ্বাসনালী আটকে যাওয়ার কারণে। তাই সাবধান! আপনার রাগ, খিটখিটে মেজাজ, সকালের ক্লান্তি — এসবের মূলেও কিন্তু লুকিয়ে থাকতে পারে এই সমস্যা।
১. সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথা ব্যথা — এটা নয়, ওটা
স্বাভাবিক মাথা ব্যথা পানির অভাবে হতে পারে। কিন্তু যদি রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে ভারী মাথা নিয়ে জাগেন, তাহলে সেটা অক্সিজেনের ঘাটতির লক্ষণ। যখন ঘুমের মাঝে শ্বাস বন্ধ থাকে, তখন মস্তিষ্কে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। ফলে মাথার রক্তনালিগুলো প্রসারিত হয়ে ব্যথা তৈরি করে। এটা কিন্তু স্লিপ অ্যাপনিয়ার লক্ষণ গুলোর মধ্যে অন্যতম। আপনি যদি সকালে চা না খেয়ে এনার্জি না পান, খেয়াল করুন, ব্যাপারটা শুধু চায়ের বদ অভ্যাস না, শরীরের ভেতরের সমস্যা।
২. বিছানা থেকে উঠেই স্মার্টফোনের দিকে তাকিয়ে ভুলে যাওয়া
মস্তিষ্ক ঘুম না হলে মেমরি স্টোর করতে পারে না। আর সেই কারণেই হঠাৎ করে জিনিসপত্র ভুলে যাওয়া, কথা বলতে গিয়ে শব্দ খুঁজে না পাওয়া—এগুলো কিন্তু কমন। ব্রেন ফগ বলে একটা জিনিস আছে।

