আচ্ছা, একটা কথা বলি—আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আপনার জিন ও স্বাস্থ্য আসলে কতটা আপনার হাতের মুঠোয়? আমরা অনেকেই মনে করি, “ওহ, আমার পরিবারে ডায়াবেটিস আছে, তাই আমারও হবেই!” কিন্তু সত্যি কথা হলো, বিজ্ঞান এখন প্রমাণ করেছে যে, আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসই আসলে সেই শক্তিশালী চাবিকাঠি, যা জিনের তালাও ভেঙে দিতে পারে।
আপনার জিনগুলো কিন্তু স্থির নয়; তারা আপনার জীবনধারার সাথে সাথে বদলাতে থাকে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন! এই ধারণাটাই এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। আপনার প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজই নির্ধারণ করে আপনার ডিএনএ কীভাবে আচরণ করবে। তাই প্রশ্ন হলো, আপনার কি সেই ৫টি অভ্যাস আছে, যা আপনাকে জিন হার মানানোর পথে এগিয়ে দেবে? সুস্থ থাকার টিপসগুলো জানা এক জিনিস, আর সেগুলো মেনে চলা আরেক জিনিস—আজ আমরা সেটাই খুঁজে বের করবো।
গত বছর, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৩০ মিনিটের নিয়মিত হাঁটা, জেনেটিকালি প্রিডিস্পোজড মানুষের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ৪৬% কমিয়ে দিতে পারে। ভাবুন তো! আমরা যারা জিনকে দোষ দিয়ে নিজেদের অসহায় ভাবি, তাদের জন্য এটা কিন্তু বিশাল একটা খবর। কারণ ডিএনএ ও লাইফস্টাইল-এর এই সম্পর্কটা হাতের মুঠোয় এলে জীবন বদলে যেতে বাধ্য।
আপনি কি জানেন, আমাদের শরীর একটা চালবাজ দালানের মতো? জিন হচ্ছে সেই দালানের নকশা (Blueprint), কিন্তু রোগ প্রতিরোধে অভ্যাস হলো সেই দালানের দেওয়ালে লাগানো সিমেন্ট। নকশা যত ভালো হোক, সিমেন্ট দুর্বল হলে দালান টিকবে না। তেমনি, জিন যত ভালো হোক, খারাপ হেলদি হ্যাবিটস না থাকলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না।

এখন অনেকেই বলবেন, “ভাই, ব্যাপারটা বুঝলাম, কিন্তু কিভাবে শুরু করবো?” একদম ঠিক প্রশ্ন। যেমনটা আপনি টিভির রিমোটে চ্যানেল বদলান, তেমনি আপনার জিনের এক্সপ্রেশনও বদলাতে পারেন। প্রথম ধাপ হলো “এপিজেনেটিক্স” নামক এক জাদুকরি প্রক্রিয়া বোঝা। এপিজেনেটিক্স মানে হলো, আপনার জিনের উপরে যে সুইচ আছে, সেগুলো অন-অফ করা। আর এই সুইচগুলো আপনার লাইফস্টাইল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
১. স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট: জিনের সবচেয়ে বড় শত্রু
আমার এক বন্ধু রাহুলের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সারাদিন অফিসের চাপ, তারপর রাত ১২টায় কাজের মেইল। তার বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন ৫০ বছর বয়সে। রাহুল সবসময় ভাবতো, “ওটাই আমার ভাগ্য।” কিন্তু যখন ও মেডিটেশন শুরু করলো, প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট করে, ৬ মাসের মধ্যে ওর ব্লাড প্রেশার এমনিতেই নরমাল হয়ে গেল। কারণটা কী? দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আপনার শরীরে কর্টিসল নামক হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা সরাসরি আপনার জিনের “ওয়ার” বাটন চেপে দেয়।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় বলা হয়েছে, নিয়মিত মাইন্ডফুলনেস প্র্যাকটিস আপনার শরীরের ২০০০+ জিনের আচরণ পরিবর্তন করে দিতে পারে। এটা কি অবিশ্বাস্য নয়? তাই আগে নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস ঠিক করুন। “এই তো, চাপ তো কমলোই, জিনও শান্ত থাকলো!”—এই হবে আপনার নতুন মন্ত্র।
আরেকটা জিনিস, রাতের ঘুম। ঘুম কিন্তু স্রেফ বিশ্রাম নয়, এটা আপনার জিনের “রিপেয়ার টাইম”। ২০১৩ সালে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ১ সপ্তাহ অপর্যাপ্ত ঘুম (রাতে ৬ ঘণ্টার কম) আপনার ৭০০টিরও বেশি জিনের কার্যকলাপকে এলোমেলো করে দিতে পারে।

২. মুভ মোর, ডিজাইন চেঞ্জ করুন
বসে থাকা কি নতুন ধূমপান? আপনি কি সারাদিন অফিসে ৮-৯ ঘণ্টা চেয়ারে আটকে থাকেন? তাহলে কিন্তু সাবধান। আমাদের শরীর চলাফেরার জন্য তৈরি, সারাক্ষণ বসে থাকার জন্য নয়। নিয়মিত ব্যায়াম আপনার শরীরে “BDNF” নামক একটি প্রোটিন বাড়ায়, যা আপনার মস্তিষ্কের জিনকে নতুন করে সাজায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী ২৫% প্রাপ্তবয়স্ক শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয়, অথচ মাত্র ১৫০ মিনিটের মাঝারি ব্যায়াম এই ঝুঁকি ৩০% কমাতে পারে।
ভাবুন তো, সপ্তাহে মাত্র ৫ দিন ৩০ মিনিট হাঁটা। এতেই আপনার ডিএনএ ও লাইফস্টাইল-এর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি হয়। ব্যায়াম শুধু ওজন কমানো নয়, এটা আপনার জিনকে বার্তা দেয় যে, “এই শরীরটা এখনও শক্তিশালী, এখনও বাঁচতে হবে!” ফলে শরীরের কোষগুলো দ্রুত মেরামত হতে থাকে। তাই আজই অফিসের লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করুন। ছোট পরিবর্তন, বড় প্রভাব।
আপনার চেয়ারের দিকে তাকান। এই চেয়ারটাই যদি আপনার জিনের জন্য কারাগার হয়ে যায়, তবে সেটা ভয়াবহ দুঃসংবাদ। তবে সমাধানও কিন্তু সহজ। প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটলেই জিনের সেই “অলস” সুইচগুলো অফ হয়ে যায়।

