ছোট্ট একটা পুতুল। হঠাৎ বলল, “তুমি কি আজ দুঃখিত?” ভাবছেন, এটা আধুনিক প্রযুক্তির চমক? একটু থামুন। ভাবুন গভীরে। এই AI খেলনাগুলো আসলে আমাদের বাচ্চাদের আবেগ পড়ে ফেলে। আর সেই ডেটা চলে যায় অচেনা কারো কাছে। আপনি কি জানতেন, আপনার সন্তানের প্রিয় রোবটটা আসলে একটা গুপ্তচর হতে পারে? হ্যাঁ, যখন খেলনা হয়ে ওঠে গুপ্তচর, তখন সেটা আর মজার বিষয় থাকে না। চলুন, আজ এই আবেগ পড়া প্রযুক্তির অদেখা বিপদগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলি।

মনে করুন, আপনার বাচ্চা স্কুল থেকে ফিরেছে। সে হতাশ। গতকালই আপনি তাকে একটা স্মার্ট খরগোশ কিনে দিয়েছেন। খরগোশটা বলছে, “তোমার ভয়েস শুনে মনে হচ্ছে তুমি ক্লান্ত। একটা গল্প বলব?” মিষ্টি লাগছে, তাই না? কিন্তু রিয়েলিটি হলো, এই খেলনা প্রতিটি কথার বিশ্লেষণ করছে। বাচ্চার প্রতিটি হাসি, প্রতিটি কান্না রেকর্ড হচ্ছে। এগুলো আসলে ডেটা গোপনীয়তার জন্য একটা বড় হুমকি।

আমার এক বন্ধু আছে, সে খুব টেক-স্যাভি। তার ছেলের জন্য একটা AI ডল কিনেছিল। কিছুদিন পরেই দেখে, ডলটা তার সন্তানের পছন্দের আইসক্রিমের ফ্লেভার থেকে শুরু করে বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম পর্যন্ত জেনে গেছে। ভয়ংকর, তাই না? আসলে এই সাইবার বিপদগুলো আমাদের নজরের আড়ালেই ঘটে যাচ্ছে।

একটি AI খেলনা শিশুর আবেগ পড়ছে, ডেটা গোপনীয়তার বিপদ সংকেত সৃষ্টি করছে

আমরা যখন বাচ্চাদের জন্য নতুন খেলনা কিনি, তখন আমরা শুধু খুশিই দেখি। কিন্তু টেক জায়ান্টরা আমাদের ডেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। ২০২২ সালের একটা রিপোর্ট বলছে, প্রায় ৭২% বাচ্চাদের খেলনা কোনো না কোনোভাবে ইউজার ডেটা কালেক্ট করে। আর এসব ডেটা পরে ব্যবহার করা হয় মার্কেটিং, টার্গেটেড অ্যাড, এমনকি আরও খারাপ কাজেও।

আচ্ছা, আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, এই শিশু নিরাপত্তাটা বাস্তবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ? যেমন ধরুন, ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন দেওয়া একটি টেডি বিয়ার। বাচ্চা ঘুমানোর সময় সেটা তার দিকে তাকিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, বাচ্চার বিছানার পাশে যে শব্দগুলো হয়, সব রেকর্ড হচ্ছে। একজন হ্যাকার যদি সেটা অ্যাক্সেস করে ফেলে? ভয়ংকর পরিস্থিতি।

বিষয়টা ঠিক সেইরকম, যেভাবে আপনার ফোন আপনার কথা শোনে। আমরা বলি, “ওহ, আমি তো আইফোনের কথা বলছিলাম, আর পরের মিনিটেই ফেসবুকে তার অ্যাড চলে আসলো!”। এটা আসলে প্রযুক্তি সচেতনতার অভাব। বাচ্চাদের খেলনার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পার্থক্য শুধু এই যে, বাচ্চারা নিজেদের আবেগ, ভয়, স্বপ্ন সবকিছু এই খেলনাকে বলে দেয়।

শিশু নিরাপত্তা হুমকি: AI খেলনা গুপ্তচরের মতো কাজ করছে, সাইবার বিপদ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে

কীভাবে এই আবেগ পড়া প্রযুক্তি কাজ করে?

সোজা ভাষায় বললে, এই খেলনাগুলোতে থাকে সেন্সর, মাইক্রোফোন, ক্যামেরা। তারা বাচ্চার মুখের অভিব্যক্তি, গলার স্বর, এমনকি শরীরের ভাষা বিশ্লেষণ করে। যেমন:

  • স্পিচ রিকগনিশন: বাচ্চা কি রেগে কথা বলছে, নাকি খুশি?
  • ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন: ক্যামেরা স্ক্যান করে দেখে, বাচ্চা কি দুঃখিত?
  • হৃদস্পন্দন: কিছু অ্যাডভান্সড খেলনা এমনকি হার্ট রেটও মাপতে পারে!

এই ডেটার কোনো সুরক্ষা নেই, বললেই চলে। কোম্পানিগুলো বলবে, “আমরা আপনার ডেটা প্রাইভেট রাখি।” কিন্তু মাঝেমধ্যেই দেখা যায়, এই ডেটা লিক হয়ে যায়। যেমন ২০১৯ সালে ক্লাউডপেট নামে এক কোম্পানির ডেটাবেস লিক হয়েছিল, যাতে ৮২ মিলিয়নেরও বেশি রেকর্ড ছিল। তার মধ্যে ছিল শিশুদের ভয়েস রেকর্ডিং। ভাবুন তো, আপনার সন্তানের ভয়েস কেউ ডাউনলোড করে নিচ্ছে!

বাবা-মায়ের কী করা উচিত?

আমি বলছি না, আপনাকে পুরনো দিনের কাঠের খেলনা কিনতে হবে। কিন্তু একটু সচেতন হওয়া দরকার। এই ডেটা গোপনীয়তা আমাদের হাতেই। নিচের কিছু টিপস ফলো করতে পারেন:

  • বেনামী ব্যবহার: খেলনা সেটআপ করার সময় বাচ্চার আসল নাম, ঠিকানা, স্কুলের নাম লিখবেন না। ডাকনাম ব্যবহার করুন।
  • ইন্টারনেট বন্ধ রাখুন: খেলনা ব্যবহার না করলে ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই অফ করে দিন।
  • কম্পানি নীতি পড়ুন: ফটোশপের মতো করে “Agree” বাটনে ক্লিক করার আগে একবার পড়ে নিন।
  • অতিরিক্ত সতর্ক: $5,000 এর কম দামের কোনো খেলনার যদি ক্যামেরা থাকে, তাহলে একটু সন্দেহ করুন। এরকম একটা AI খেলনা কিনতে দাম কমপক্ষে ৫০০০ টাকা হতে হবে।