মাথাব্যথা বা জ্বর হলেই হাত বাড়াই আমরা। ঘরে-বাইরে সবচেয়ে সহজলভ্য ওষুধের নাম প্যারাসিটামল। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই সাধারণ ওষুধ নিয়ে গবেষণা আর বিশ্বাস-এর মধ্যে কত বড় ফারাক? সম্প্রতি কিছু বিজ্ঞান সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। খবরটা হলো, গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল সেবন আর অটিজম ঝুঁকির মধ্যে যোগসূত্র থাকতে পারে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই দাবি শুনে মাত্র ১৫% মানুষই এটা মানতে রাজি। বাকি ৮৫% কেন মানছে না? আসল রহস্যটা আমাদের মনের গভীরে লুকিয়ে।
চিন্তা করে দেখুন তো। যেই ওষুধটা আমরা এত বিশ্বাস নিয়ে খাই, সেটা নিয়ে এত বড় একটা দাবি এলো কোথা থেকে? প্রথম প্রতিক্রিয়াই হয়তো অস্বীকার। “এ আবার কী কথা!” কিন্তু এই যে আমরা মানতে চাইছি না, এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলোই বেশি শক্তিশালী।
একটা গবেষণা দেখিয়েছে, মানুষ নতুন তথ্যের চেয়ে পুরনো ধারণাকেই বেশি আঁকড়ে ধরে। এটাকে বলে ‘কনফার্মেশন বায়াস’। আমরা যা বিশ্বাস করি, শুধু সেটার সপক্ষেই প্রমাণ খুঁজি। প্যারাসিটামল নিরাপদ – এই ধারণাটা আমাদের মাথায় পাকাপোক্ত। তাই বিপরীত তথ্য এলেই মস্তিষ্ক রীতিমতো প্রতিরোধ তৈরি করে।

বিশ্বাস বনাম বিজ্ঞান: কেন এই দ্বন্দ্ব?
বিজ্ঞানীরা যখন বলেন, “সম্ভাব্য যোগসূত্র আছে”, আমরা শুনি, “নিশ্চিতভাবে কারণ”। এখানেই গড়মিল। গবেষণা বলছে ঝুঁকি বাড়তে *পারে*। কিন্তু আমরা ভাবি, “তাহলে আমার সন্তানেরও হতে পারে!” এই ভয় আর অতিসরলীকরণই সত্যকে ঢেকে দেয়।
আরেকটা বড় ব্যাপার হলো, মিডিয়ার ভূমিকা। শিরোনাম হয় চমকপ্রদ। কিন্তু জটিল বিজ্ঞানের সূক্ষ্ম ব্যাখ্যা কেউ পড়ে না। ফলে তৈরি হয় ভুল ধারণা। যেমন, একটা সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৭০%ই বলেছেন, তারা শুধু হেডলাইন পড়েই মতামত দেন। পুরো গবেষণাপত্র পড়েন মাত্র ২%!

আমাদের মন কীভাবে তথ্য ফিল্টার করে?
মনস্তত্ত্ব বলে, আমরা দু’রকম ভাবে চিন্তা করি। দ্রুত আর ধীর। প্যারাসিটামল-অটিজম সংযোগের খবরটা এলেই, আমাদের দ্রুত চিন্তার সিস্টেম সক্রিয় হয়। এটা কাজ করে ভয় আর পূর্বধারণা দিয়ে।
- ভয়: অটিজম একটি জটিল, জীবনব্যাপী অবস্থা। এর সাথে প্রিয় একটি ওষুধকে যুক্ত করাটা ভয়ানক লাগে।
- নিয়ন্ত্রণের অভাব: মনে হয়, “তাহলে তো গর্ভাবস্থায় সামান্য ব্যথার জন্যও কিছু খাওয়া যাবে না?” এই অসহায়ত্ব অস্বীকারকে ডেকে আনে।
- কাছের উদাহরণ: আমরা ভাবি, “আমার বোন তো গর্ভাবস্থায় প্যারাসিটামল খেয়েছে, তার সন্তান তো ঠিক আছে!” ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে আমরা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিই।
একটা মজার পরিসংখ্যান দেখুন। ২০২৩-এর এক জরিপে দেখা গেছে, যারা নিজেদের ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ দাবি করেন, তারাও শুধুমাত্র সেই বিজ্ঞানকেই বিশ্বাস করেন যা তাদের আগের বিশ্বাসের সাথে মেলে। মানে, বিশ্বাস এখানে যুক্তির আগে কাজ করে।

তাহলে ১৫% মানুষ কেন মানলো?
এই ছোট্ট গ্রুপটিই সম্ভবত ‘ধীর চিন্তার’ পথ বেছে নিয়েছে। তারা শুধু শিরোনাম না পড়ে গভীরে গিয়েছে। তারা বুঝেছে, গবেষণা বলছে ‘সম্পর্ক থাকতে পারে’, ‘একমাত্র কারণ’ নয়। তারা ঝুঁকি আর নিশ্চিত কারণের পার্থক্যটা জানে।
এরা হয়তো স্বাস্থ্য সচেতনতা-র জন্য নিয়মিত ভালো বিজ্ঞান সংবাদ পড়ে। তারা জানে, বিজ্ঞান স্থির নয়, বিবর্তনশীল। আজকের নতুন তথ্য আগামীকালের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে। তাদের বিশ্বাস অন্ধ নয়, জ্ঞাননির্ভর।
আমাদের কী করা উচিত? ভয় পাবো নাকি সচেতন হবো?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আতঙ্কিত না হওয়া। গর্ভবতী মায়েরা হুট করে প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ খাওয়া বন্ধ করবেন না। বরং করণীয় হলো:
- সরাসরি ডাক্তারের সাথে কথা বলুন: যেকোনো শঙ্কা নিয়ে আলোচনা করুন।
- সূত্র যাচাই করুন: সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট না, দেখুন মূল গবেষণাপত্র
