আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, আপনার খুব কাছের মানুষটা চোখের সামনে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে? একটা সময় ছিল, যার মনে রাখার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ, তিনিই আজ ভুলে যান চাবিটা কোথায় রাখলেন। আলঝেইমার রোগ নীরবে ঘর বদলে দেয়, সম্পর্ক বদলে দেয়। কিন্তু ভাবুন তো, যদি বলা হতো রক্তের একটা সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই বলতে পারে আপনার ভবিষ্যৎ? অবিশ্বাস্য শোনালেও এটাই এখন বৈজ্ঞানিক সত্য। আজকের আর্টিকেলে আমরা সেই নীরব সংকেত নিয়েই কথা বলবো, যেটাকে আমরা এড়িয়ে যাই — আলঝেইমারের ঝুঁকি লুকিয়ে আছে আপনার রক্তেই, আর যে পরীক্ষাটা করাবেন না, সেটাই বড় ভুল হতে পারে।

ব্যস্ত শহরের জীবনে আমরা সবাই কমবেশি ভুলে যাই। “কি নাম বলো তো?” — এই ছোট্ট প্রশ্নটা এখন প্রায় নিত্যদিনের। তবে সমস্যাটা তখনই গুরুতর, যখন এটা নিয়মিত হয়ে ওঠে। আমরা ধরে নিই বয়সের কারণে এমনটা হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞান এখন নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। রক্তে আলঝেইমার সনাক্তকরণ এখন আর কল্পনা নয়, বাস্তব। গবেষকরা বলছেন, মস্তিষ্কে সমস্যা শুরু হওয়ার ১৫-২০ বছর আগেই রক্তে কিছু প্রোটিনের মাত্রা বদলাতে শুরু করে। ঠিক যেমনটা বৃষ্টির আগে আকাশে মেঘ জমে — লক্ষণটা আগেই বোঝা যায়, যদি আপনি খেয়াল করেন।

আমার এক বন্ধুর বাবার কথা মনে পড়ে যায়। অত্যন্ত সুস্থ-সবল মানুষ। ৬৫ বছর বয়সে হঠাৎ তার নিয়মিত কাজে ভুল হতে লাগল। সবাই বলল, “বয়স হয়েছে, কি আর হবে!” আমরা কেউ গুরুত্ব দিলাম না। আজ তার বয়স ৭২, কিন্তু তিনি নিজের ছেলেকেও চিনতে পারেন না। দিনের পর দিন একটা অসহায় অবস্থা। পরে ডাক্তার জানালেন, আলঝেইমার ডায়াগনোসিস যদি আগে হতো, অন্তত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেত। এই কথাটাই আমাকে আজ এই লেখাটা লিখতে বাধ্য করেছে। কারণ, এটা আমরা অনেকেই জানি না যে একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষাই জীবন বদলে দিতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই পরীক্ষাটা আসলে কী? সহজ ভাষায় বললে, আপনার রক্তে কিছু নির্দিষ্ট বায়োমার্কার (biomarkers) খোঁজা হয়। যেমন p-tau217 নামের একটা প্রোটিন। গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের মস্তিষ্কে অ্যামাইলয়েড প্লেক জমতে শুরু করে, তাদের রক্তে এই প্রোটিনের মাত্রা বেড়ে যায়। ২০২৪ সালে সুইডেনের এক বড় গবেষণায় দেখা গেছে, রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সাইলেন্ট লক্ষণ ধরা পড়ার হার প্রায় ৯০% নির্ভুল। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে, তাই না? কিন্তু এটাই বাস্তবতা।

আমরা সাধারণত ডাক্তারের কাছে যাই যখন উপসর্গ প্রকট হয়। যেমনটা বলা হয়, “গাধাটা যখন পড়ে গেছে, তখন সিঁড়ি বানানোর কোনো মানে হয় না।” এই পরীক্ষাটা কিন্তু সেই ‘সিঁড়ি’ আগে থেকেই বানানোর সুযোগ দেয়। আলঝেইমার প্রতিরোধ সম্ভব না, তবে ঝুঁকি কমিয়ে রোগের সূত্রপাত বহু বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষাটা আপনাকে সেই ‘হেড-আপ’ দেয়। ধরুন, আপনার বাবার বা মায়ের আলঝেইমার ছিল। আপনি কি জানতে চান না আপনার নিজের ঝুঁকি কতটুকু? ৫০% বংশগত ঝুঁকি থাকে এমন পরিবারে।

এরপর আসে মূল প্রশ্ন — এই পরীক্ষাটা কীভাবে করাবেন? সাধারণত নিউরোলজিস্ট বা জেরিয়াট্রিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শে এই পরীক্ষা করা হয়। খরচটা একটু বেশি হতে পারে, কিন্তু ভাবুন তো, একবার জানার জন্য কতটা মূল্য দিতে পারেন? এটি মাত্র ১০-১৫ মিলিলিটার রক্ত। কোনো জটিলতা নেই। কিন্তু ফলাফল জানার পর যদি আপনি জীবনযাত্রায় বদল আনেন — যেমন ঘুম ঠিক করা, মানসিক চাপ কমানো, নিয়মিত ব্যায়াম করা — তাহলে কী হবে? রক্ত পরীক্ষাটা শুধু একটা সতর্কবার্তা নয়, এটা একটা সুযোগ — নিজের ভবিষ্যৎ নিজে সাজানোর।

কেন এই নীরব লক্ষণগুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়?

এটা ভাবার বিষয়। আমরা যখন কফি খেতে ভুলে যাই, দোকান থেকে দুধ আনতে ভুলে যাই, তখন আমরা হাসি, বলি “আমার স্মৃতিশক্তি খারাপ হয়ে গেছে!” কিন্তু এগুলো কি সত্যিই আলঝেইমারের ঝুঁকি নির্দেশ করে? চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ ভুলে যাওয়া আর রোগের শুরুর দিকের লক্ষণের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। যেমন — আপনি কি চায়ের কাপটা রান্নাঘরে রেখে ফ্রিজে খুঁজছেন? নাকি চা খেয়েছেন মনে নেই? দ্বিতীয়টা বেশি উদ্বেগের।

এর মধ্যে আরও একটা ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন, আলঝেইমার শুধু বয়স্কদের রোগ। কিন্তু রক্তে আলঝেইমার সনাক্তকরণ এখন দেখাচ্ছে যে, ৪০-৫০ বছর বয়সেও মস্তিষ্কে পরিবর্তন শুরু হতে পারে। বলা হয়, ‘অ্যামাইলয়েড ক্যাসকেড’ প্রক্রিয়াটা অনেক আগেই শুরু হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের বয়স ৪৫-৬০, তাদের মধ্যে প্রায় ১০% লোকের রক্তে ঝুঁকিপূর্ণ প্রোটিনের মাত্রা পাওয়া গেছে, যদিও তাদের কোনো উপসর্গই ছিল না! এটাই সবচেয়ে ভয়ের জায়গা। দেখতে দেখতে বছরের পর বছর

Categorized in: