কখনো কি মনে হয়েছে, গোটা দিনের সব জ্বালা-যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে শেষে রাতে বালিশে মুখ গুঁজে একটা বিকট চিৎকার দিলে মনটা হালকা হয়ে যাবে? আমরা সবাই কমবেশি এই ভুল ধারণায় বিশ্বাস করি। কিন্তু সত্যি কি তাই? চিৎকারের বিজ্ঞান কিন্তু আমাদের এই ভাবনাকে পুরোপুরি উল্টে দিতে পারে। জীবনে নানান সময়ে আমরা মনে করি, একটু জোরে চিৎকার করলেই বুঝি সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে, মনটা পরিষ্কার হয়ে যাবে। এই বিশ্বাসকে মনোবিজ্ঞানে বলে ক্যাথারসিস কী সেই তত্ত্ব, যেখানে আবেগের চাপকে বাষ্পের মতো ছেড়ে দিলে মনে শান্তি আসে। তবে ভাবুন তো, আপনি কি সত্যিই চিৎকার করে সমস্যার সমাধান করতে পেরেছেন? নাকি আরও বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন? প্রশ্নটা হলো—চিৎকার একবার, হাসি পরে? বিজ্ঞান কিন্তু এখানে আমাদের চেনা পথের বাইরে অন্য কিছু বলছে।
আমার নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলি। কয়েক বছর আগে একটা প্রকল্পের চাপে মাথায় হাত ছিল। এক বিকেলে ছাদে গিয়ে যা মুখ ফুঁসে চিৎকার দিয়েছিলাম, পাড়ার লোকজন জানালা দিয়ে উঁকি দিয়েছিল। চিৎকার শেষে মনে হয়েছিল একটু রিলিফ, কিন্তু রাত ১০টার দিকে সেই একই অস্থিরতা ফিরে এলো, দ্বিগুণ হয়ে। তারপর বুঝলাম, এটা আসলে মানসিক চাপ মুক্তি নয়, বরং নিজেকে ফাঁকি দেওয়ার একটা পদ্ধতি। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, চিৎকার করলে মুহূর্তের জন্য অ্যাড্রেনালিন বাড়ে, কিন্তু এতে মস্তিষ্কের অভ্যাস পরিবর্তন হয় না। হ্যাঁ, প্রথম কয়েক সেকেন্ডে মনে হয় যেন ভার লাঘব হলো, কিন্তু সেই ভার তো আসলে বাইরে থেকে আসা চাপ, আর আমরা সেটাকে ভেতরে আরও গভীরে চাপা দিই। আসলে আবেগ নিয়ন্ত্রণ মানে জোরে জোরে গলা ফাটানো নয়—এটা সচেতনভাবে নিজের অনুভূতিকে পরিচালনা করার নাম। ব্যাপারটা ডাবের জলের মতো—দেখতে হালকা, কিন্তু ভেতরে এনার্জি আরও জমা করে।
ধরুন, আপনি একটা বেলুনকে জোর করে ফুলিয়ে ফুলিয়ে শেষে ফুঁসে ছেড়ে দিলেন। দেখে মনে হবে একদম হালকা হয়ে গেল! কিন্তু বেলুনের ভেতরের বাতাস তো বেরিয়ে গেল, দড়িটা আপনার হাতেই ড্যাবে ড্যাবে কাঁপছে। আর ঠিক এভাবেই আমাদের আবেগের অবস্থা। চিৎকারের উপকারিতা আছে, সেটা অস্বীকার করছি না—কিছু পরিস্থিতিতে জোরে চিৎকার পেশির টান কমায়, কিন্তু এটা স্থায়ী সমাধান নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কেন চিৎকারকে “ভালো” জিনিস মনে করি? কারণ আমাদের সমাজ, সিনেমা আর পুরনো ধারণা আমাদের শিখিয়েছে যে, রাগ বা দুঃখ প্রকাশ করতে হলে তাকে জোরে চিৎকার বের করে দিলেই সকল সমস্যার অবসান হয়। কিন্তু আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, চিৎকার বা চাপ প্রকাশ করার পর অনেক মানুষের রাগ আরও বেড়ে যায়—শান্ত হওয়ার বদলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাই টেনশনে চিৎকার করাটা হয়তো ওষুধ খাওয়ার আগে শুধু চকচকে কাগজ দেখার মতো—বাহিরটা মিষ্টি, ভেতরটা তিক্ত।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যখন চিৎকার করি, তখন আমাদের মস্তিষ্কের amygdala নামক অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে। এটা আসলে আমাদের ভয় আর আতঙ্কের কেন্দ্র। প্রতিবার চিৎকার করলে মস্তিষ্ক এই আতঙ্কের অনুভূতিকে শক্তিশালী করে। ফলে পরের বার একটু রাগ হলে আমরা আরও সহজে চিৎকার দিই—এটা একটা লুপে পরিণত হয়। আমার এক ক্লায়েন্ট ছিলেন, প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে বালিশে মুখ চাপা দিয়ে চিৎকার করতেন। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই চিৎকারের পর কী হয়?” তিনি বললেন, “কিছুক্ষণের জন্য ভালো লাগে, কিন্তু তারপর আবার মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়।” এটাই মূল সমস্যা। আমরা যত বেশি চিৎকার করি, আমাদের মস্তিষ্ক তত বেশি এই আচরণকে “স্বাভাবিক” হিসেবে গ্রহণ করে নেয়। মনোবিজ্ঞান ও চিৎকার নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এটি একটা ফাঁদ—যতই আমরা চিৎকার করি, আবেগের মাত্রা ততই বাড়তে থাকে, কমতে চায় না।
তাহলে মুক্তির উপায় কী? এখানেই আসে হাসি ও কান্নার বিজ্ঞান। বিজ্ঞান বলছে, কান্না বা হাসি—এই দুটোই আমাদের আবেগের প্রাকৃতিক আউটলেট, কিন্তু চিৎকার নয়। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন? কান্নার পর মানুষ অনেক বেশি শান্ত থাকে, কারণ কান্নার সময় আমরা শরীর থেকে কিছু নির্দিষ্ট হরমোন বের করে দিই যা আমাদের মনকে শান্ত করে। কিন্তু চিৎকারে কোন হরমোন নির্গত হয় না; বরং অ্যাড্রেনালিন আর কর্টিসল—দুটোই স্ট্রেস হরমোন—শরীরে ঢুকে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত চিৎকার করে তাদের রক্তচাপ হঠাৎ বেড়ে যায় এবং হার্ট রেট বৃদ্ধি পায়। তাই চিৎকার একবারে শোনা গেলেও, তারপর হাসি নয়, বরং আরও গভীর দুশ্চিন্তা শুরু হতে পারে।
চিৎকারের বিজ্ঞান নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা একটু গভীরে যাই। ধরুন, আপনি ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন যিনি পরীক্ষার হলে গিয়ে সব ভুলে গেলেন, তারপর পানীয় জলের বোতলটা হাতে চেপে ধরলেন। বোতলের ওপর চাপটা যত বাড়ছে, বোতলের কাঠামো দুর্বল হবে, তেম
