ভাবুন তো, অফিসের মিটিংয়ে বসে আছেন, ডেডলাইন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে, আর আপনার মনে হচ্ছে মাথাটা যেন ফেটেই যাবে! ঠিক তখনই আপনার সহকর্মী পাশের ডেস্ক থেকে একটা স্ট্রেস রিলিফ ফল বের করে খাচ্ছেন, আর দেখে মনে হচ্ছে তাঁর দিব্যি শান্তি।
আচ্ছা, কখনো কি ভেবেছেন, মানসিক চাপ কমানোর ফল আসলে কোনটা? আমরা সবাই চকলেট বা আইসক্রিমের দিকে ছুটে যাই, কিন্তু পুষ্টিবিদরা কিন্তু অন্য রকম কিছু খান। আজ আমি আপনাকে সেই রহস্যটাই ভাঙবো। ইন্টারনেট ঘেঁটে বা বই পড়ে নয়, বরং আমি যাদের সাথে কাজ করেছি, সেই অভিজ্ঞ পুষ্টিবিদদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে বলছি।
আমার নিজের এক বন্ধু আছে, নাম রিয়া। সে একজন ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্ট। প্রতিদিন অন্তত ৫ জন রোগী আসে তাঁর কাছে শুধুই স্ট্রেস আর অ্যাজাইটি নিয়ে। রিয়ার প্রেসক্রিপশনে কিন্তু দামি সাপ্লিমেন্ট থাকে না। থাকে একটা সাধারণ ফল। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়ছেন! পুষ্টিবিদদের পরামর্শ ফল কিন্তু মোটেও বাহারি নয়।
আপনারা যারা ভাবছেন, স্ট্রেস মানেই শরীর খারাপ, রক্তচাপ বাড়া, সেই পুরনো ধারণাটা একটু বদলান। কারণ, এর সমাধান কিন্তু আপনার রান্নাঘরেই লুকিয়ে আছে। আর এই ফলটা খেলে যে শুধু মন ভালো হয় তা না, বরং কর্টিসল কমানোর খাবার তালিকার সেরা জায়গাটা দখল করে আছে। ভাবছেন, এত গোপন কীসের? ধৈর্য ধরুন, তাহলেই জানবেন।
আচ্ছা, একটা পরীক্ষা করি। আপনি যখন খুব টেনশনে থাকেন, তখন আপনার শরীরের ভেতরে কী ঘটে? একটা হরমোন নিঃসৃত হয়, যার নাম কর্টিসল। এটা কিন্তু খারাপ কিছু না, অল্প অল্প করে দরকার। কিন্তু যখন এই কর্টিসলটা শরীরে বাড়াবাড়ি রকমের বেড়ে যায়, তখন ঘুম নষ্ট, মুড সুইং, আর খিদে বাড়ার মতো সমস্যা শুরু হয়। সে সময় আমাদের শরীর আসলে কী চায়?
আমি যখন রিয়ার সাথে কথা বলছিলাম, তখন সে আমাকে একটা মজার কথা বলল। সে বলল, “মানুষ মনে করে স্ট্রেসে মিষ্টি খাবে, কিন্তু মিষ্টি কর্টিসলকে আরও বাড়িয়ে দেয়।” তাহলে সমাধান কী? আমরা এখন কথা বলবো সেই ফল নিয়ে, যেটা খেলে আপনার ব্রেনে একটা ভিন্ন কেমিক্যাল রিলিজ হয়। এই ফলটা খেলে মনে হবে যেন আপনার মস্তিষ্ককে একটা ঠান্ডা বালিশে বিশ্রাম দেওয়া হলো। মানসিক স্বাস্থ্য ও ফল নিয়ে গবেষণা বলছে, পটাশিয়াম আর ম্যাগনেসিয়ামে ভরপুর একটা ফল প্রতিদিন খেলে স্ট্রেস লেভেল প্রায় ২৫% পর্যন্ত কমতে পারে।
ভাবছেন, এত গুণের ফলটা নিশ্চই আমলকি বা ড্রাগন ফল! না না, বন্ধুরা, ভুল করছেন। একদম সাদামাটা, সহজলভ্য, সস্তা একটা ফল। যেটা আমরা প্রায় সবাই খাই, কিন্তু গুণাগুণ জানি না। সেই ফলটার নাম হলো কলা। হ্যাঁ, সেটাই। স্ট্রেসে খাওয়ার সেরা ফল কিন্তু কলাই।
এখন প্রশ্ন হলো, কলাই বা কেন? কারণ, কলায় প্রচুর পরিমাণে ট্রিপটোফ্যান আছে। এই অ্যামাইনো অ্যাসিডটা শরীরে গিয়ে সেরোটোনিন তৈরিতে সাহায্য করে। আর সেরোটোনিন হলো “হ্যাপি হরমোন”। এই হরমোনটা যখন বাড়ে, তখন আপনার মন ভালো থাকে, আত্মবিশ্বাস বাড়ে। আমরা যখন স্ট্রেসে থাকি, তখন আমাদের শরীরের পটাশিয়ামের মাত্রা কমে যায়। যার ফলে পেশিতে টান, খিঁচুনি, আর বুক ধড়ফড় করতে পারে। একটা মাঝারি আকারের কলায় প্রায় ৪২২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। এই পটাশিয়ামই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং হার্টকে শান্ত রাখে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কলা খান, তাদের মধ্যে স্ট্রেস ও ক্লান্তির অনুভূতি ৪৫% কম থাকে। একে ওকালতি করছি না, কিন্তু জার্নাল অফ নিউট্রিশনাল বায়োকেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত একটা গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাগনেসিয়াম ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ কমিয়ে দেয়। আর কলায় এই দুই খনিজ পদার্থই ভরপুর।
শুধু কি তাই? কলায় আছে ভিটামিন বি৬। এই ভিটামিনটা কিন্তু মাসিক পূর্ববর্তী উপসর্গ (PMS) এবং মুড সুইং-এর জন্য দারুণ কার্যকরী। আমার এক ক্লায়েন্ট ছিল, সে খুবই চাপে থাকত পরীক্ষার সময়। সে প্রতিদিন সকালে একটা করে কলা খাওয়া শুরু করল। এক মাস পর সে বলল, “আগের চেয়ে অনেক শান্ত লাগছে, পরীক্ষার ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয় না এখন।” প্রাকৃতিক অ্যান্টি-স্ট্রেস ফল হিসেবে কলার জুড়ি নেই। এটা যেমন তাত্ক্ষণিক এনার্জি দেয়, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে।
কেন শুধু কলা? আর কী কী খেতে পারেন?
আমি কিন্তু বলছি না, শুধু কলাই ভরসা। আরও কিছু ফল আছে যেগুলো আপনার নার্ভাস সিস্টেমকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে। তবে কলার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটা সারাবছর পাওয়া যায়
